
সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দাবি করেছেন, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা বদলের সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ওই প্রক্রিয়ায় অনিয়মের সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এমন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তির জায়গা কারাগারে হওয়া উচিত, অথচ তিনি বঙ্গভবনে রয়েছেন—যা দেশের মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঢাকার কাওরান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব মন্তব্য করেন। ‘সংশোধিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬: ব্যাংকিং খাত আবারও ঝুঁকিতে’ শীর্ষক এই আলোচনায় সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন সংগঠনটির সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
অনুষ্ঠানে বক্তারা সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের মতে, এই বিধানের ফলে একীভূত বা পুনর্গঠিত ব্যাংকের সাবেক মালিক ও পরিচালকদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা জানান, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সহায়তার একটি ছোট অংশ (৭.৫ শতাংশ) আগাম পরিশোধ করে এবং বাকি অর্থ ১০ শতাংশ সুদে দুই বছরে পরিশোধের শর্তে এ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেন। প্রথমত, অনিয়মকারীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে বেনামি ঋণ ও হুন্ডি বন্ধ করা, যার জন্য ক্যাশলেস ব্যবস্থার প্রসার জরুরি; এবং তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিতসহ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা আরও গুরুতর রূপ নিতে পারে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সংঘাতের স্থানে পরিণত করতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ম কঠোরভাবে মানার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এ আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী, সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোসতাক খান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম, এনসিপির সারোয়ার তুষার, সিএফএ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আসিফ খান, প্রথম আলোর শওকত হোসেন মাসুম এবং ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ।
বক্তারা মনে করেন, নতুন এই আইনি ধারা ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে এবং পুরো খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেন।
উল্লেখ্য, ইসলামী ব্যাংকের ২০১৭ সালের মালিকানা পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। ওই বছরের জুনে মো. সাহাবুদ্দিন জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকটির পরিচালক (পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যান) হন এবং ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পদত্যাগ করেন। এস আলম গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অনিয়মিত ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংস্থা নতুন আইনের ১৮(ক) ধারাকে বিতর্কিত হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, এটি অনিয়মকারীদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, অনিয়মে জড়িত কেউই মালিকানায় ফিরে আসতে পারবে না।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা ব্যাংক খাতে স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।





