
সংবিধান সংশোধন হবে, নাকি ব্যাপক সংস্কার করা হবে—এই মৌলিক প্রশ্নে রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলে স্পষ্ট বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এই মতভেদের কারণে সংবিধান পর্যালোচনার লক্ষ্যে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সংবিধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ধরনের অবস্থান তৈরি হয়েছে। এক পক্ষের ধারণা, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত বিতর্কিত সংশোধনীগুলো বাতিল বা সংশোধন করলেই গণতান্ত্রিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার সম্ভব। অপরদিকে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট নতুন প্রেক্ষাপটে একটি বড় অংশ পুরো সংবিধান সংস্কারের দাবি তুলছে। দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে ঠিক করতে হবে কোন পথে এগোনো হবে; লক্ষ্য নির্ধারণ ছাড়া কমিটি গঠনের কোনো যৌক্তিকতা নেই, কারণ এটি আদর্শগত প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা হবে কি না, সে বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে না উঠলে এই অচলাবস্থা কাটবে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর অগ্রাধিকার নিয়েও জোটগুলো এখনো একমত হতে পারেনি।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’-এর ভিত্তিতে সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও বিরোধী জামায়াত-এনসিপি জোট ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’র জন্য সদস্যদের নাম দেয়নি। তারা গণভোটের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও গণভোট-সংক্রান্ত আদেশ সংসদে বাতিল হওয়ায় তাদের অবস্থান কিছুটা নমনীয় হয়েছে, তবুও সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়া নিয়ে তারা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে আগামী সংসদ অধিবেশনের আগে এই কমিটি গঠন সম্ভব হচ্ছে না।
গত ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ‘জুলাই সনদ’-এর আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একই প্রস্তাব করেছিলেন। আইনমন্ত্রী জানান, ১২ সদস্যের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে বিএনপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের আসন অনুপাতে তাদের জন্য পাঁচজন সদস্য মনোনয়নের অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী বিএনপি থেকে সাতজন এবং অন্যান্য দল থেকে পাঁচজন সদস্য রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দল সদস্যদের নাম দিলে পরদিনই বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
তবে বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, তারা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে, কিন্তু বর্তমান উদ্যোগটি সংশোধনের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। এই বিষয়ে তাদের মধ্যে আগের মতপার্থক্য এখনো বহাল রয়েছে। জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক অধিবেশন শেষ হলেও বিরোধী জোট তাদের সদস্যদের নাম জমা দেয়নি, ফলে কমিটি গঠন করা যায়নি। আগামী জুনে বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকায় তার আগে এই কমিটি গঠন সম্ভব নয়। এর ফলে ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ আরও পিছিয়ে গেল।




